শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা

প্রথম অধ্যায় { অর্জুনবিষাদযোগ }

শ্লোক ০১
সংস্কৃত
ধৃতরাষ্ট্র উবাচ: ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ। মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।
বাংলা অর্থ
ধৃতরাষ্ট্র বললেন—হে সঞ্জয়! পবিত্র ধর্মভূমি কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের কামনায় সমবেত হয়ে আমার পুত্রগণ এবং পাণ্ডুপুত্রগণ কী করল?
শ্লোক ০২
সংস্কৃত
সঞ্জয় উবাচ: দৃষ্ট্বা তু পাণ্ডবানীকং ব্যূঢ়ং দুর্যোধনস্তদা। আচার্যমুপসঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীত্।।
বাংলা অর্থ
সঞ্জয় বললেন—পাণ্ডবদের সৈন্যব্যুহ দেখে রাজা দুর্যোধন আচার্য দ্রোণের কাছে গিয়ে এই কথাগুলি বললেন।
শ্লোক ০৩
সংস্কৃত
পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমুাম্। ব্যূঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা।।
বাংলা অর্থ
হে আচার্য! আপনার বুদ্ধিমান শিষ্য দ্রুপদপুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্বারা ব্যূহবদ্ধ পাণ্ডবদের এই বিশাল সৈন্যবাহিনী দেখুন।
শ্লোক ০৪
সংস্কৃত
অত্র শূরা মহেশ্বাসা ভীমার্জুনসমা যুধি। যুযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথঃ।।
বাংলা অর্থ
এখানে ভীম ও অর্জুনের মতো অনেক বীর ধনুর্ধর রয়েছেন; যেমন— সাত্যকি, বিরাট এবং মহারথী দ্রুপদ।
শ্লোক ০৫
সংস্কৃত
ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশিরাজশ্চ বীর্যবান্। পুরুজিৎ কুন্তিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ।।
বাংলা অর্থ
আরও আছেন ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, বলবান কাশিরাজ, পুরুজিৎ, কুন্তিভোজ এবং শ্রেষ্ঠ বীর শৈব্য।
শ্লোক ০৬
সংস্কৃত
যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান্। সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ।।
বাংলা অর্থ
পরাক্রমশালী যুধামন্যু, বীর উত্তমৌজা, সুভদ্রাপুত্র অভিমন্যু এবং দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্র— এঁরা সকলেই মহারথী।
শ্লোক ০৭
সংস্কৃত
অস্মাকং তু বিশিষ্টা যে তান্নিবোধ দ্বিজোত্তম। নায়কা মম সৈন্যস্য সংজ্ঞার্থং তান্ ব্রবীমি তে।।
বাংলা অর্থ
হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ! আমাদের পক্ষেও যারা প্রধান সেনাপতি, আপনার জানার জন্য আমি তাঁদের নাম বলছি।
শ্লোক ০৮
সংস্কৃত
ভবান্ ভীষ্মশ্চ কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিটিঞ্জয়ঃ। অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তিস্তথৈব চ।।
বাংলা অর্থ
আপনি স্বয়ং, ভীষ্ম, কর্ণ, বিজয়ী কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা, বিকর্ণ এবং সোমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবা।
শ্লোক ০৯
সংস্কৃত
অন্যে চ বহবঃ শূরা মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ। নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধবিশারদাঃ।।
বাংলা অর্থ
এ ছাড়াও আমার জন্য জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত আরও অনেক বীর আছেন, যাঁরা নানা অস্ত্রে সজ্জিত এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী।
শ্লোক ১০
সংস্কৃত
অপর্যাপ্তং তদস্মাকং বলং ভীষ্মাভিব রক্ষিতম্। পর্যাপ্তং ত্বিদমেতেষাং বলং ভীমাভিব রক্ষিতম্।।
বাংলা অর্থ
ভীষ্মদেব দ্বারা রক্ষিত আমাদের সৈন্যবল অপরিমিত (অজেয়), কিন্তু ভীম দ্বারা রক্ষিত পাণ্ডবদের সৈন্যবল সীমিত।
শ্লোক ১১
সংস্কৃত
অয়িনেষু চ সর্বেষু যথাভাগমবস্থিতাঃ। ভীষ্মমেবাভিব রক্ষন্তু ভবন্তঃ সর্ব এব হি।।
বাংলা অর্থ
অতএব আপনারা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সেনাপতি ভীষ্মকে সব দিক থেকে রক্ষা করুন।
শ্লোক ১২
সংস্কৃত
তস্য সংজনয়ন হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ। সিংহনাদং বিনদ্যোচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্।।
বাংলা অর্থ
তখন কৌরবদের বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম দুর্যোধনের আনন্দ বৃদ্ধির জন্য সিংহের মতো গর্জন করে উচ্চস্বরে শঙ্খ বাজালেন।
শ্লোক ১৩
সংস্কৃত
ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ। সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোহভবত্।।
বাংলা অর্থ
এরপর শঙ্খ, ভেরী, দামামা ও রণশিঙাগুলো হঠাৎ একসঙ্গে বেজে উঠল এবং সেই শব্দ অত্যন্ত প্রবল হলো।
শ্লোক ১৪
সংস্কৃত
ততঃ শ্বেতৈর্হয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ। মাধবঃ পাণ্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদ্যধ্মতুঃ।।
বাংলা অর্থ
তারপর শ্বেত অশ্বযুক্ত এক বিশাল রথে বসে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন তাঁদের দিব্য শঙ্খ বাজালেন।
শ্লোক ১৫
সংস্কৃত
পাঞ্চজন্যং হৃষীকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ। পৌণ্ড্রং দধ্মৌ মহাশঙ্খং ভীমকর্মা বৃকোদরঃ।।
বাংলা অর্থ
শ্রীকৃষ্ণ 'পাঞ্চজন্য', অর্জুন 'দেবদত্ত' এবং ভয়ানক কর্মকারী ভীম 'পৌণ্ড্র' নামক মহাশঙ্খ বাজালেন।
শ্লোক ১৬
সংস্কৃত
অনন্তবিজয়ং রাজা কুন্তীপুত্রো যুধিষ্ঠিরঃ। নকুলঃ সহদেবশ্চ সুঘোষমণিপুষ্পকৌ।।
বাংলা অর্থ
কুন্তিপুত্র রাজা যুধিষ্ঠির 'অনন্তবিজয়', নকুল 'সুঘোষ' এবং সহদেব 'মণিপুষ্পক' শঙ্খ বাজালেন।
শ্লোক ১৭
সংস্কৃত
কাশ্যশ্চ পরমেস্বাসঃ শিখণ্ডী চ মহারথঃ। ধৃষ্টদ্যুম্নো বিরাটশ্চ সাত্যকিশ্চাপরাজিতঃ।।
বাংলা অর্থ
শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর কাশিরাজ, মহারথী শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট এবং অপরাজেয় সাত্যকিও শঙ্খ বাজালেন।
শ্লোক ১৮
সংস্কৃত
দ্রুপদোদ্রৌপদেয়াশ্চ সর্বশঃ পৃথিবীপতিঃ। সৌভদ্রশ্চ মহাবাহুঃ শঙ্খান্ দধ্মুঃ পৃথক্ পৃথক্।।
বাংলা অর্থ
হে পৃথিবীপতি! দ্রুপদ, দ্রৌপদীর পুত্রগণ এবং মহাবাহু অভিমন্যু— প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা শঙ্খ বাজালেন।
শ্লোক ১৯
সংস্কৃত
স ঘোষো ধার্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়াণি ব্যদারয়ত্। নভশ্চ পৃথিবীং চৈব তুমুলোহভ্যনুনাদয়ন্।।
বাংলা অর্থ
সেই ভয়ানক শব্দ আকাশ ও পৃথিবী কাঁপিয়ে দিয়ে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় বিদীর্ণ করল।
শ্লোক ২০
সংস্কৃত
অথ ব্যবস্থিতান্ দৃষ্ট্বা ধার্তরাষ্ট্রান্ কপিধ্বজঃ। প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে ধনুরাদ্যম্য পাণ্ডবঃ।।
বাংলা অর্থ
হে রাজন! এরপর অর্জুন কৌরবদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত দেখে এবং অস্ত্র চালনা শুরু হওয়ার ঠিক আগে ধনু তুলে নিলেন।
শ্লোক ২১
সংস্কৃত
হৃষীকেশং তদা বাক্যমিদমাহ মহীপতে। অর্জুন উবাচ: সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে রথং স্থাপয় মেঽচ্যুত।।
বাংলা অর্থ
অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বললেন— হে অচ্যুত! আমার রথটি দুই সৈন্যদলের মাঝখানে স্থাপন করুন।
শ্লোক ২২
সংস্কৃত
যাবদেতান্নিরীক্ষেঽহং যোদ্ধুকামানবস্থিতান্। কৈর্ময়া সহ যোদ্ধব্যমস্মিন্ রণসমুদ্যমে।।
বাংলা অর্থ
যাতে আমি এখানে যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের দেখে নিতে পারি এবং বুঝতে পারি কাদের সঙ্গে আমাকে যুদ্ধ করতে হবে।
শ্লোক ২৩
সংস্কৃত
যোৎস্যমানানবেক্ষেঽহং য এতেঽত্র সমাগতাঃ। ধার্তরাষ্ট্রস্য দুর্বুদ্ধেরুদ্ধে প্রিয়চিকীর্ষবঃ।।
বাংলা অর্থ
দুর্বুদ্ধি সম্পন্ন দুর্যোধনকে তুষ্ট করার জন্য যারা এখানে যুদ্ধ করতে সমবেত হয়েছে, আমি তাদের দেখতে চাই।
শ্লোক ২৪
সংস্কৃত
সঞ্জয় উবাচ: এবমুক্তো হৃষীকেশো গুড়াকেশেন ভারত। সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে স্থাপয়িত্বা রথোত্তমম্।।
বাংলা অর্থ
সঞ্জয় বললেন— হে ভারত! অর্জুন একথা বললে শ্রীকৃষ্ণ উভয় পক্ষের সৈন্যদলের মাঝখানে সেই শ্রেষ্ঠ রথটি স্থাপন করলেন।
শ্লোক ২৫
সংস্কৃত
ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ সর্বেষাং চ মহীক্ষিতাম্। উবাচ পার্থ পশ্যৈতান সমবেতান কুরূনিতি।।
বাংলা অর্থ
ভীষ্ম ও দ্রোণাচার্যের সামনে রথটি রেখে শ্রীকৃষ্ণ বললেন— হে পার্থ! যুদ্ধের জন্য সমবেত কৌরবদের দেখো।
শ্লোক ২৬
সংস্কৃত
তত্রাপশ্যত্ স্থিতান্ পার্থঃ পিতৃনথ পিতামহান্। আচার্যান্ মাতুলান্ ভ্রাতৃন্ পুত্ৰান্ পৌত্রান্ সখীংস্তথা। শ্বশুরান্ সুহৃদশ্চৈব সেনয়োরুভয়োরপি।।
বাংলা অর্থ
অর্জুন সেখানে দুই দলের মধ্যেই পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য, মাতুল, ভাই, পুত্র, পৌত্র, বন্ধু, শ্বশুর ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের দেখতে পেলেন।
শ্লোক ২৭
সংস্কৃত
তান্ সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্বান্ বন্ধূনবস্থিতান্। কৃপয়া পরয়াবিষ্টো বিষীদন্তিদমব্রবীত্।।
বাংলা অর্থ
সমবেত আত্মীয়দের দেখে কুন্তিপুত্র অর্জুন অত্যন্ত করুণায় আচ্ছন্ন ও বিষাদগ্রস্ত হয়ে এই কথা বললেন।
শ্লোক ২৮
সংস্কৃত
অর্জুন উবাচ: দৃষ্ট্বেদং স্বজনং কৃষ্ণ যুযুৎসুং সমুপস্থিতম্। সীদন্তি মম গাত্রাণি মুখং চ পরিশুয্যতি।।
বাংলা অর্থ
অর্জুন বললেন— হে কৃষ্ণ! যুদ্ধের জন্য উপস্থিত এই স্বজনদের দেখে আমার অঙ্গগুলো শিথিল হয়ে যাচ্ছে এবং মুখ শুকিয়ে আসছে।
শ্লোক ২৯
সংস্কৃত
বেপথুশ্চ শরীরে মে রোমহর্ষশ্চ জায়তে। গাণ্ডীবং স্রংসতে হস্তাত্ ত্বক্ চৈব পরিদহ্যতে।।
বাংলা অর্থ
আমার শরীরে কম্পন হচ্ছে, রোমাঞ্চ হচ্ছে, হাত থেকে গাণ্ডীব ধনু খসে পড়ছে এবং চামড়া যেন জ্বলে যাচ্ছে।
শ্লোক ৩০
সংস্কৃত
ন চ শক্নোম্যবস্থাতুং ভ্রমতীব চ মে মনঃ। নিমিত্তানি চ পশ্যামি বিপরীতানি কেশব।।
বাংলা অর্থ
হে কেশব! আমি আর স্থির থাকতে পারছি না, মন ঘুরছে এবং আমি কেবল অমঙ্গলসূচক লক্ষণগুলোই দেখছি।
শ্লোক ৩১
সংস্কৃত
ন চ শ্রেয়োহনুপশ্যামি হত্বা স্বজনমাহবে। ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ।।
বাংলা অর্থ
যুদ্ধে স্বজনদের হত্যা করে আমি কোনো কল্যাণ দেখছি না। হে কৃষ্ণ! আমি বিজয়, রাজ্য বা সুখ— কিছুই চাই না।
শ্লোক ৩২
সংস্কৃত
কিং নো রাজ্যেন গোবিন্দ কিং ভোগৈর্জীবিতেন বা। যেষামর্থে কাঙ্ক্ষিতং নো রাজ্যং ভোগাঃ সুখানি চ।।
বাংলা অর্থ
হে গোবিন্দ! যাদের জন্য আমরা রাজ্য ও সুখ কামনা করি, তাদের ছাড়া এই রাজ্য বা জীবন দিয়ে আমাদের কী লাভ?
শ্লোক ৩৩
সংস্কৃত
ত ইমেহবস্থিতা যুদ্ধে প্রাণাংস্ত্যক্ত্বা ধনানি চ। আচার্যাঃ পিতরঃ পুত্রাস্তথৈব চ পিতামহাঃ।।
বাংলা অর্থ
সেই আচার্য, পিতৃতুল্য ব্যক্তি, পুত্র ও পিতামহরা জীবন ও ধনের আশা ছেড়ে এই যুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
শ্লোক ৩৪
সংস্কৃত
মাতুলাঃ শ্বশুরাঃ পৌত্রাঃ শ্যালাঃ সম্বন্ধিনস্তথা।।
বাংলা অর্থ
আরও আছেন মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক ও আত্মীয়স্বজনরা।
শ্লোক ৩৫
সংস্কৃত
এতান্ন হন্তমিচ্ছামি ঘ্নতোঽপি মধুসূদন। অপি ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য হেতোঃ কিং নু মহীকৃতে।।
বাংলা অর্থ
হে মধুসূদন! এরা আমাকে মারলেও আমি এদের মারতে চাই না— এমনকি ত্রিভুবনের রাজ্যের বিনিময়েও নয়, তবে পৃথিবীর জন্য কেন?
শ্লোক ৩৬
সংস্কৃত
নিহত্য ধার্তরাষ্ট্রান্নঃ কা প্রীতিঃ স্যাজ্জনার্দন। পাপমেবাশ্রয়েদস্মান্ হত্বৈতানাততায়িনঃ।।
বাংলা অর্থ
হে জনার্দন! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করে আমাদের কী তৃপ্তি হবে? এই আততায়ীদের মারলে আমাদের কেবল পাপই হবে।
শ্লোক ৩৭
সংস্কৃত
তস্মান্নার্হা বয়ং হন্তুং ধার্তরাষ্ট্রান্ সবান্ধবান্। স্বজনং হি কথং হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধব।।
বাংলা অর্থ
তাই আত্মীয়সহ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করা আমাদের সাজে না। হে মাধব! স্বজনদের মেরে আমরা কীভাবে সুখী হব?
শ্লোক ৩৮
সংস্কৃত
যদ্যপ্যেতে ন পশ্যন্তি লোভোপহতচেতসঃ। কুলক্ষয়কৃতং দোষং মিত্রদ্রোহে চ পাতকম্।।
বাংলা অর্থ
লোভের কারণে এরা বংশ ধ্বংসের দোষ বা মিত্রদ্রোহের পাপ বুঝতে পারছে না।
শ্লোক ৩৯
সংস্কৃত
কথং ন জ্ঞেয়মস্মাভিঃ পাপাদস্মান্নিবর্তিতুম্। কুলক্ষয়কৃতং দোষং প্রপশ্যদ্ভিন জনার্দন।।
বাংলা অর্থ
কিন্তু হে জনার্দন! বংশ ক্ষয়ের পরিণাম জেনেও আমরা কেন এই পাপ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করব না?
শ্লোক ৪০
সংস্কৃত
কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি কুলধর্মাঃ সনাতনাঃ। ধর্মে নষ্টে কুলং কৃৎস্নমধর্মোহভিভবত্যুত।।
বাংলা অর্থ
বংশ ধ্বংস হলে সনাতন কুলধর্ম নষ্ট হয়, আর ধর্ম নষ্ট হলে পুরো বংশ অধর্মের কবলে পড়ে।
শ্লোক ৪১
সংস্কৃত
অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়ঃ। স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসংকরঃ।।
বাংলা অর্থ
হে কৃষ্ণ! অধর্ম বেড়ে গেলে কুলবধূরা বিপথগামী হয়, আর স্ত্রীরা বিপথগামী হলে বর্ণসংকর সন্তান জন্ম নেয়।
শ্লোক ৪২
সংস্কৃত
সংকরো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ। পতন্তি পিতরো হ্যেষাং লুপ্তপিণ্ডোদকক্রিয়াঃ।।
বাংলা অর্থ
বর্ণসংকর অবস্থা বংশনাশকদের নরকের পথে নিয়ে যায় এবং তাঁদের পূর্বপুরুষেরাও তর্পণ না পেয়ে অধপতিত হন।
শ্লোক ৪৩
সংস্কৃত
দোষৈরেতৈঃ কুলঘ্নানাং বর্ণসংকরকারকৈঃ। উত্সাদ্যন্তে জাতিধর্মাঃ কুলধর্মাশ্চ শাশ্বতাঃ।।
বাংলা অর্থ
বংশনাশকদের এই দোষের ফলে শাশ্বত জাতিধর্ম ও কুলধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যায়।
শ্লোক ৪৪
সংস্কৃত
উত্ন্নকুলধর্মাণাং মনুষ্যাণাং জনার্দন। নরকেঽনিয়তং বাসো ভবতীত্যনুশুশ্রুম।।
বাংলা অর্থ
হে জনার্দন! আমরা শুনেছি যাদের কুলধর্ম নষ্ট হয়েছে, তাদের দীর্ঘকাল নরকবাস করতে হয়।
শ্লোক ৪৫
সংস্কৃত
অহো বত মহত্ পাপং কর্তুং ব্যবসিতা বয়ম্। যদ্রাজ্যসুখলোভেন হন্তুং স্বজনমুদ্যতাঃ।।
বাংলা অর্থ
হায়! কী দুর্ভাগ্য যে আমরা রাজ্যসুখের লোভে স্বজনদের হত্যা করার মতো মহাপাপ করতে প্রস্তুত হয়েছি।
শ্লোক ৪৬
সংস্কৃত
যদি মামপ্রতীকারমশস্ত্রং শস্ত্রপাণয়ঃ। ধার্তরাষ্ট্রা রণে হন্যুস্তন্মে ক্ষেমতরং ভবেত্।।
বাংলা অর্থ
যদি ধৃতরাষ্ট্রের অস্ত্রধারী পুত্ররা আমাকে নিরস্ত্র ও যুদ্ধবিমুখ অবস্থায় রণক্ষেত্রে হত্যা করে, তবে সেটিই আমার জন্য বেশি মঙ্গলের হবে।
শ্লোক ৪৭
সংস্কৃত
সঞ্জয় উবাচ: এবমুক্ত্বার্জুনঃ সংখ্যে রথোপস্থ উপাবিশত্। বিসৃজ্য সশরং চাপং শোকসংবিগ্নমানসঃ।।
বাংলা অর্থ
সঞ্জয় বললেন— যুদ্ধক্ষেত্রে এই কথা বলে শোকাতুর হৃদয়ে অর্জুন তাঁর ধনুর্বাণ ত্যাগ করে রথের আসনে বসে পড়লেন।
উপসংহার
অধ্যায় সমাপ্তি
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াম যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে 'অর্জুনবিষাদযোগো' নাম প্রথম অধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ।
শেষ কথা
এখানেই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ‘অর্জুনবিষাদযোগ’ নামক প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত হলো।