হে ভারত! দ্বাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, অশ্বিনীকুমারদ্বয় ও ঊনপঞ্চাশৎ মরুৎগণকে দর্শন করো এবং এর আগে অন্য কেউ যা দেখেনি, সেই সমস্ত আশ্চর্যজনক রূপসমূহ অবলোকন করো।
হে বিশ্বেশ্বর! হে বিশ্বরূপ! আমি আপনাকে সর্বত্রই অনেক বাহু, অনেক উদর, অনেক মুখ এবং অনেক চক্ষুবিশিষ্ট অনন্তরূপে দেখছি; আপনার অন্ত, মধ্য বা আদি—কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
আমি আপনাকে কিরীট, গদা ও চক্রধারী, সর্বত্র দীপ্তিমান তেজোরাশিরূপে দেখছি; প্রদীপ্ত অগ্নি ও সূর্যের মতো তেজবিশিষ্ট আপনার এই রূপ অত্যন্ত দুর্নিরীক্ষ্য এবং অপরিমেয়।
আমি আপনাকে আদি, মধ্য ও অন্তহীন, অনন্ত শক্তিমান, অসংখ্য বাহুবিশিষ্ট, চন্দ্র ও সূর্যরূপ নেত্রসম্পন্ন এবং প্রদীপ্ত অগ্নিময় মুখবিশিষ্ট দেখছি; আপনি নিজের তেজে এই বিশ্বকে উত্তপ্ত করছেন।
হে মহাত্মন! স্বর্গ ও মর্ত্যের অন্তরাল এবং সমস্ত দিক একাই আপনার দ্বারা ব্যাপ্ত হয়ে আছে। আপনার এই অদ্ভুত ও ভয়ংকর রূপ দেখে ত্রিভুবন অত্যন্ত ভীত ও ব্যথিত হচ্ছে।
ঐ দেবগণ আপনার মধ্যেই প্রবেশ করছেন; কেউ কেউ ভীত হয়ে হাত জোড় করে আপনার গুণগান করছেন। মহর্ষি ও সিদ্ধগণ 'স্বস্তি' বা 'মঙ্গল হোক' এই কথা বলে বহু স্তোত্রের দ্বারা আপনার স্তব করছেন।
হে মহাবাহো! অনেক মুখ ও চক্ষুবিশিষ্ট, অনেক বাহু, উরু ও পদবিশিষ্ট, অনেক উদরযুক্ত এবং অনেক ভয়ংকর দন্তবিশিষ্ট আপনার এই বিশাল রূপ দেখে সকল লোক এবং আমিও ব্যথিত হচ্ছি।
হে বিষ্ণু! আকাশচুম্বী, জ্যোতির্ময়, বহু বর্ণযুক্ত, প্রসারিত মুখ ও প্রদীপ্ত বিশাল চক্ষুবিশিষ্ট আপনাকে দেখে আমার অন্তরাত্মা ভীত হচ্ছে; আমি ধৈর্য ও শান্তি পাচ্ছি না।
তাঁরা সকলেই ত্বরান্বিত হয়ে আপনার ভয়ংকর ও দন্তবিশিষ্ট মুখে প্রবেশ করছেন; কাউকে কাউকে দেখা যাচ্ছে যে তাঁদের মাথা চূর্ণ হয়ে আপনার দাঁতের ফাঁকে আটকে আছে।
হে উগ্ররূপী দেববর! আপনি কে, তা আমাকে বলুন। আপনাকে প্রণাম করি, আপনি প্রসন্ন হোন। হে আদি পুরুষ! আমি আপনাকে বিশেষভাবে জানতে চাই, কারণ আপনার এই প্রবৃত্তির উদ্দেশ্য আমি বুঝতে পারছি না।
শ্রীভগবান বললেন—আমি লোকক্ষয়কারী প্রবৃদ্ধ কাল; এখন লোকসমূহকে সংহার করতে প্রবৃত্ত হয়েছি। তুমি যুদ্ধ না করলেও প্রতিপক্ষীয় যোদ্ধারা কেউই জীবিত থাকবে না।
অতএব তুমি যুদ্ধার্থে উথিত হও এবং যশ লাভ করো; শত্রুদের জয় করে সমৃদ্ধ রাজ্য ভোগ করো। এরা আমার দ্বারাই আগে নিহত হয়েছে; হে সব্যসাচিন! তুমি কেবল নিমিত্তমাত্র হও।
দ্রোণ, ভীষ্ম, জয়দ্রথ, কর্ণ এবং অন্যান্য বীর যোদ্ধারা আমার দ্বারাই নিহত হয়েছেন, তুমি তাঁদের বিনাশ করো; ব্যথিত হয়ো না। যুদ্ধ করো, যুদ্ধে তুমি অবশ্যই শত্রুদের পরাজিত করবে।
আপনিই আদিদেব, সনাতন পুরুষ এবং এই বিশ্বের পরম আশ্রয়। আপনিই জ্ঞাতা, আপনিই জ্ঞাতব্য বস্তু এবং আপনিই পরম ধাম। হে অনন্তরূপ! আপনার দ্বারাই এই সমগ্র বিশ্ব পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে।
হে সর্বস্বরূপ! আপনাকে সামনে থেকে ও পেছন থেকে নমস্কার; আপনাকে সব দিক থেকেই নমস্কার। আপনি অনন্ত বীর্য ও অসীম বিক্রমশালী; আপনি সমস্ত জগৎকে ব্যাপ্ত করে আছেন, তাই আপনিই সর্বস্বরূপ।
হে অচ্যুত! বিহার, শয়ন, উপবেশন ও ভোজনের সময় একাকী বা অন্যদের সামনে পরিহাসচ্ছলে আপনার যে অবমাননা করেছি, হে অপ্রমেয়! সেজন্য আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
অতএব আমি দণ্ডবৎ প্রণাম করে স্তুতিযোগ্য ঈশ্বর আপনার প্রসন্নতা ভিক্ষা করছি। পিতা যেমন পুত্রের, সখা যেমন সখার এবং প্রিয় যেমন প্রিয়ার অপরাধ সহ্য করেন, আপনিও তেমনি আমার অপরাধ ক্ষমা করুন।
আগে কখনও দেখিনি এমন রূপ দেখে আমি আনন্দিত হয়েছি এবং ভয়ে আমার মন ব্যথিত হচ্ছে। হে দেবেশ! হে জগন্নিবাস! আপনি প্রসন্ন হোন এবং আপনার সেই পূর্বরূপই আমাকে দেখান।