শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা

একাদশ অধ্যায় { বিশ্বরূপদর্শনযোগ }

শ্লোক ০১
সংস্কৃত
অর্জুন উবাচ: মদনুগ্রহায় পরমং গুহ্যমধ্যাত্মসংজ্ঞিতম্। যত্ত্বয়োক্তং বচস্তেন মোহোঽয়ং বিগতো মম।।
বাংলা অর্থ
অর্জুন বললেন—আমার প্রতি অনুগ্রহ করার জন্য আপনি যে পরম গুহ্য অধ্যাত্মতত্ত্ব কথা বললেন, তার দ্বারা আমার মোহ দূর হয়েছে।
শ্লোক ০২
সংস্কৃত
ভবাপ্যয়ৌ হি ভূতানাং শ্রুতৌ বিস্তরশো ময়া। ত্বত্তঃ কমলপত্রাক্ষ মাহাত্ম্যমপি চাব্যয়ম্।।
বাংলা অর্থ
হে কমললোচন! ভূতগণের সৃষ্টি ও প্রলয় আপনার থেকে বিস্তারিতভাবে শুনেছি এবং আপনার অক্ষয় মহিমাও জ্ঞাত হলাম।
শ্লোক ০৩
সংস্কৃত
এবমেতদ্যথাত্থ ত্বমাত্মানং পরমেশ্বর। দ্রষ্টুমিচ্ছামি তে রূপমৈশ্বরং পুরুষোত্তম।।
বাংলা অর্থ
হে পরমেশ্বর! আপনি নিজের সম্বন্ধে যা বললেন তা ঠিক, কিন্তু হে পুরুষোত্তম! আমি আপনার ঐশ্বরিক রূপ প্রত্যক্ষ করতে ইচ্ছা করি।
শ্লোক ০৪
সংস্কৃত
মন্যসে যদি তচ্ছক্যং ময়া দ্রষ্টুমিতি প্রভো। যোগেশ্বর ততো মে ত্বং দর্শয়াত্মানমব্যয়ম্।।
বাংলা অর্থ
হে প্রভো! আপনি যদি মনে করেন যে আপনার সেই রূপ দর্শন করা আমার পক্ষে সম্ভব, তবে হে যোগেশ্বর! আমাকে আপনার সেই অক্ষয় রূপ দর্শন করান।
শ্লোক ০৫
সংস্কৃত
শ্রীভগবানুবাচ: পশ্য মে পার্থ রূপাণি শতশোঽথ সহস্রশঃ। নানাবিধানি দিব্যানি নানাবর্ণাকৃতিমি চ।।
বাংলা অর্থ
শ্রীভগবান বললেন—হে পার্থ! তুমি আমার শত শত এবং সহস্র সহস্র বিচিত্র দিব্য বর্ণ ও আকৃতিবিশিষ্ট রূপসমূহ দর্শন করো।
শ্লোক ০৬
সংস্কৃত
পশ্যাদিত্যান্বসূনরুদ্রানশ্বিনৌ মরুতাংস্তথা। বহূন্যদৃষ্টপূর্বাণি পশ্যাশ্চর্যাণি ভারত।।
বাংলা অর্থ
হে ভারত! দ্বাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, অশ্বিনীকুমারদ্বয় ও ঊনপঞ্চাশৎ মরুৎগণকে দর্শন করো এবং এর আগে অন্য কেউ যা দেখেনি, সেই সমস্ত আশ্চর্যজনক রূপসমূহ অবলোকন করো।
শ্লোক ০৭
সংস্কৃত
ইহৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ্যাদ্য সচরাচরম্। মম দেহে গুড়াকেশ যচ্চান্যদ্দষ্টুমিচ্ছসি।।
বাংলা অর্থ
হে গুড়াকেশ! এই আমার দেহে এক স্থানে অবস্থিত সমস্ত স্থাবর-জঙ্গমাত্মক জগৎ এবং আর যা কিছু তুমি দেখতে চাও, তা আজই দর্শন করো।
শ্লোক ০৮
সংস্কৃত
ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুমনেনৈব স্বচক্ষুষা। দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্।।
বাংলা অর্থ
কিন্তু তুমি তোমার এই চর্মচক্ষুর দ্বারা আমাকে দেখতে সমর্থ হবে না, তাই আমি তোমাকে দিব্য চক্ষু দান করছি; এর দ্বারা তুমি আমার ঐশ্বরিক যোগশক্তি অবলোকন করো।
শ্লোক ০৯
সংস্কৃত
সঞ্জয় উবাচ: এবমুক্ত্বা ততো রাজন মহাযোগেশ্বরো হরিঃ। দর্শয়ামাস পার্থায় পরমং রূপমৈশ্বরম্।।
বাংলা অর্থ
সঞ্জয় বললেন—হে রাজন! মহাযোগেশ্বর হরি অর্জুনকে এই কথা বলে তাঁর পরম ঐশ্বরিক বিশ্বরূপ প্রদর্শন করালেন।
শ্লোক ১০
সংস্কৃত
অনেকবক্ত্রনয়নমনেকাদ্ভুতদর্শনম্। অনেকদিব্যাভরণং দিব্যানেকোদ্যতায়ুধম্।।
বাংলা অর্থ
সেই বিশ্বরূপে অনেক মুখ, অনেক চক্ষু, অনেক অদ্ভুত দৃশ্য, অনেক দিব্য অলঙ্কার এবং অনেক উদ্যত দিব্য অস্ত্রশস্ত্র বর্তমান ছিল।
শ্লোক ১১
সংস্কৃত
দিব্যমাল্যাম্বরধরং দিব্যগন্ধানুলেপনম্। সর্বাশ্চর্যময়ং দেবমনন্তং বিশ্বতোমুখম্।।
বাংলা অর্থ
তিনি দিব্য মাল্য ও বস্ত্র পরিহিত ছিলেন, তাঁর দেহে দিব্য গন্ধদ্রব্য অনুলিপ্ত ছিল; তিনি সর্বাশ্চর্যময়, জ্যোতির্ময়, অনন্ত এবং সব দিকে তাঁর মুখ।
শ্লোক ১২
সংস্কৃত
দিবি সূর্যসহস্রস্য ভবেদ্যুগপদুত্থিতা। যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাদ্ভাস্তস্য মহাত্মনঃ।।
বাংলা অর্থ
আকাশে যদি হাজার সূর্যের আলো একসঙ্গে প্রকাশিত হয়, তবে সেই আলো সম্ভবত সেই মহাত্মার বিশ্বরূপের তেজের সমান হতে পারে।
শ্লোক ১৩
সংস্কৃত
তত্ৰৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং প্রবিভক্তমনেকধা। অপশ্যদ্দেবদেবস্য শরীরে পাণ্ডবস্তদা।।
বাংলা অর্থ
তখন অর্জুন দেবদেবের শরীরে বহু প্রকারে বিভক্ত সমগ্র জগৎকে এক স্থানে অবস্থিত দেখতে পেলেন।
শ্লোক ১৪
সংস্কৃত
ততঃ স বিস্ময়াবিষ্টো হৃষ্টরোমা ধনঞ্জয়ঃ। প্রণম্য শিরসা দেবং কৃতাঞ্জলিরভাষত।।
বাংলা অর্থ
অতঃপর অর্জুন বিস্মিত হয়ে এবং কণ্টকিত শরীরে মস্তক অবনত করে দেবকে প্রণাম করে হাত জোড় করে বললেন।
শ্লোক ১৫
সংস্কৃত
অর্জুন উবাচ: পশ্যামি দেবাংস্তব দেব দেহে সর্বাংস্তথা ভূতবিশেষসঙ্ঘান্। ব্রহ্মাণমীশং কমলাসনস্থ-মৃষীংশ্চ সর্বানুরগাংশ্চ দিব্যান্।।
বাংলা অর্থ
অর্জুন বললেন—হে দেব! আপনার দেহে সকল দেবতাকে, স্থাবর-জঙ্গম প্রাণিবৃন্দকে, পদ্মাসনস্থ ব্রহ্মা ও শিবকে এবং সমস্ত ঋষি ও দিব্য সর্পগণকে দর্শন করছি।
শ্লোক ১৬
সংস্কৃত
অনেকবাহূদরবক্ত্রনেত্রং পশ্যামি ত্বাং সর্বত্রোহনন্তরূপম্। নান্তং ন মধ্যং ন পুনস্তবাদিং পশ্যামি বিশ্বেশ্বর বিশ্বরূপ।।
বাংলা অর্থ
হে বিশ্বেশ্বর! হে বিশ্বরূপ! আমি আপনাকে সর্বত্রই অনেক বাহু, অনেক উদর, অনেক মুখ এবং অনেক চক্ষুবিশিষ্ট অনন্তরূপে দেখছি; আপনার অন্ত, মধ্য বা আদি—কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
শ্লোক ১৭
সংস্কৃত
কিরীটিনং গদিনং চক্রিণং চ তেজোরাশিং সর্বত্র দীপ্তিমন্তম্। পশ্যামি ত্বাং দুর্নিরীক্ষ্যং সমন্তা-দ্দীপ্তানলার্কদ্যুতিমপ্রমেয়ম্।।
বাংলা অর্থ
আমি আপনাকে কিরীট, গদা ও চক্রধারী, সর্বত্র দীপ্তিমান তেজোরাশিরূপে দেখছি; প্রদীপ্ত অগ্নি ও সূর্যের মতো তেজবিশিষ্ট আপনার এই রূপ অত্যন্ত দুর্নিরীক্ষ্য এবং অপরিমেয়।
শ্লোক ১৮
সংস্কৃত
ত্বমক্ষরং পরমং বেদিতব্যং ত্বমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্। ত্বমব্যয়ঃ শাশ্বতধর্মগোপ্তা সনাতনস্ত্বং পুরুষো মতো মে।।
বাংলা অর্থ
আপনিই পরম অক্ষর ও জ্ঞাতব্য বস্তু; আপনিই এই বিশ্বের পরম আশ্রয়; আপনিই অব্যয়, শাশ্বত ধর্মের রক্ষক এবং আপনিই সনাতন পুরুষ—এটাই আমার অভিমত।
শ্লোক ১৯
সংস্কৃত
অনাদিমধ্যান্তমনন্তবীর্য-মনন্তবাহুং শশিসূর্যনেত্রম্। পশ্যামি ত্বাং দীপ্তহুতাশবক্ত্রং স্বতেজসা বিশ্বমিদং তপন্তম্।।
বাংলা অর্থ
আমি আপনাকে আদি, মধ্য ও অন্তহীন, অনন্ত শক্তিমান, অসংখ্য বাহুবিশিষ্ট, চন্দ্র ও সূর্যরূপ নেত্রসম্পন্ন এবং প্রদীপ্ত অগ্নিময় মুখবিশিষ্ট দেখছি; আপনি নিজের তেজে এই বিশ্বকে উত্তপ্ত করছেন।
শ্লোক ২০
সংস্কৃত
দ্যাবাভূম্যোরিদমন্তরং হি ব্যাপ্তং ত্বয়ৈকেন দিশশ্চ সর্বাঃ। দৃষ্ট্বাদ্ভুতং রূপমুগ্রং তবেদং লোকত্রয়ং প্রব্যথিতং মহাত্মন্।।
বাংলা অর্থ
হে মহাত্মন! স্বর্গ ও মর্ত্যের অন্তরাল এবং সমস্ত দিক একাই আপনার দ্বারা ব্যাপ্ত হয়ে আছে। আপনার এই অদ্ভুত ও ভয়ংকর রূপ দেখে ত্রিভুবন অত্যন্ত ভীত ও ব্যথিত হচ্ছে।
শ্লোক ২১
সংস্কৃত
অমী হি ত্বাং সুরসঙ্ঘা বিশন্তি কেচিদ্ভীতাঃ প্রাঞ্জলয়ো গৃণন্তি। স্বস্তীত্যুক্ত্বা মহর্ষিসিদ্ধসঙ্ঘাঃ স্তুবন্তি ত্বাং স্তুতিভিঃ পুষ্কলাভিঃ।।
বাংলা অর্থ
ঐ দেবগণ আপনার মধ্যেই প্রবেশ করছেন; কেউ কেউ ভীত হয়ে হাত জোড় করে আপনার গুণগান করছেন। মহর্ষি ও সিদ্ধগণ 'স্বস্তি' বা 'মঙ্গল হোক' এই কথা বলে বহু স্তোত্রের দ্বারা আপনার স্তব করছেন।
শ্লোক ২২
সংস্কৃত
রুদ্রাদিত্যা বসবো যে চ সাধ্যা বিশ্বেঽশ্বিনৌ মরুতশ্চোষ্মপাশ্চ। গন্ধর্বযক্ষাসুরসিদ্ধসঙ্ঘা বীক্ষন্তে ত্বাং বিস্মিতাশ্চৈব সর্বে।।
বাংলা অর্থ
রুদ্র, আদিত্য, বসু, সাধ্য, বিশ্বদেব, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, মরুৎগণ, পিতৃগণ এবং গন্ধর্ব, যক্ষ, অসুর ও সিদ্ধগণ—সকলেই বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে আপনাকে দেখছেন।
শ্লোক ২৩
সংস্কৃত
রূপং মহত্তে বহুবক্ত্রনেত্রং মহাবাহো বহুবাহূরুপাদম্। বহূদ রং বহুদংষ্ট্রাকরালং দৃষ্ট্বা লোকাঃ প্রব্যথিতাস্তথাহম্।।
বাংলা অর্থ
হে মহাবাহো! অনেক মুখ ও চক্ষুবিশিষ্ট, অনেক বাহু, উরু ও পদবিশিষ্ট, অনেক উদরযুক্ত এবং অনেক ভয়ংকর দন্তবিশিষ্ট আপনার এই বিশাল রূপ দেখে সকল লোক এবং আমিও ব্যথিত হচ্ছি।
শ্লোক ২৪
সংস্কৃত
নভঃস্পৃশং দীপ্তমনেকবর্ণং ব্যাত্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম্। দৃষ্ট্বা হি ত্বাং প্রব্যথিতান্তরাত্মা ধৃতিং ন বিন্দামি শমং চ বিষ্ণো।।
বাংলা অর্থ
হে বিষ্ণু! আকাশচুম্বী, জ্যোতির্ময়, বহু বর্ণযুক্ত, প্রসারিত মুখ ও প্রদীপ্ত বিশাল চক্ষুবিশিষ্ট আপনাকে দেখে আমার অন্তরাত্মা ভীত হচ্ছে; আমি ধৈর্য ও শান্তি পাচ্ছি না।
শ্লোক ২৫
সংস্কৃত
দংষ্ট্রাকরালানি চ তে মুখানি দৃষ্ট্বৈব কালানলসন্নিভানি। দিশো ন জানে ন লভে চ শর্ম প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস।।
বাংলা অর্থ
প্রলয়াগ্নির মতো উজ্জ্বল ও ভয়ংকর দন্তবিশিষ্ট আপনার মুখসমূহ দেখে আমি দিক্ভ্রান্ত হচ্ছি এবং শান্তি পাচ্ছি না। হে দেবেশ! হে জগন্নিবাস! আপনি প্রসন্ন হোন।
শ্লোক ২৬
সংস্কৃত
অমী চ ত্বাং ধৃতরাষ্ট্রস্য পুত্রাঃ সর্বে সহৈবাবনিপালসঙ্ঘৈঃ। ভীষ্মো দ্রোণঃ সূতপুত্রস্তথাসৌ সহাস্মদীয়ৈরপি যোধমুখ্যৈঃ।।
বাংলা অর্থ
ঐ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা এবং তাঁদের সাথে সকল রাজন্যবর্গ, ভীষ্ম, দ্রোণ এবং ঐ কর্ণ আমাদের প্রধান যোদ্ধাদের সাথে আপনার মুখে প্রবেশ করছেন।
শ্লোক ২৭
সংস্কৃত
বক্ত্রাণি তে ত্বরমাণা বিশন্তি দংষ্ট্রাকরালানি ভয়ানকানি। কেচিদ্বিলগ্না দশনান্তেরষু দৃশ্যন্তে চূর্ণিতৈরুত্তমাঙ্গৈঃ।।
বাংলা অর্থ
তাঁরা সকলেই ত্বরান্বিত হয়ে আপনার ভয়ংকর ও দন্তবিশিষ্ট মুখে প্রবেশ করছেন; কাউকে কাউকে দেখা যাচ্ছে যে তাঁদের মাথা চূর্ণ হয়ে আপনার দাঁতের ফাঁকে আটকে আছে।
শ্লোক ২৮
সংস্কৃত
যথা নদীনং বহুবোঽম্বুবেগাঃ সমুদ্রমেবাভিমুখা দ্রবন্তি। তথা তবামীব নরলোকবীরা বিশন্তি বক্ত্রাণ্যভিতো জ্বলন্তি।।
বাংলা অর্থ
নদীসমূহের জলরাশি যেমন সমুদ্রের অভিমুখেই ধাবিত হয়, তেমনি এই নরলোকের বীরগণ আপনার প্রদীপ্ত মুখসমূহে প্রবেশ করছেন।
শ্লোক ২৯
সংস্কৃত
যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতঙ্গা বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধবেগাঃ। তথৈব নাশায় বিশন্তি লোকাস্তবাপি বক্ত্রাণি সমৃদ্ধবেগাঃ।।
বাংলা অর্থ
পতঙ্গরা যেমন বিনাশের জন্য অত্যন্ত বেগে জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করে, তেমনি এই লোকসমূহও বিনাশের জন্য অত্যন্ত বেগে আপনার মুখে প্রবেশ করছে।
শ্লোক ৩০
সংস্কৃত
লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমন্তাল্লোকান্ সমগ্রান্ বদনৈর্জ্বলদ্ভিঃ। তেজোভিরাপূর্য জগৎ সমগ্রং ভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো।।
বাংলা অর্থ
আপনি আপনার প্রদীপ্ত মুখসমূহের দ্বারা সমগ্র জগৎকে গ্রাস করে বারবার লেহন করছেন। হে বিষ্ণু! আপনার উগ্র তেজরাশি সমগ্র জগৎকে পূর্ণ করে উত্তপ্ত করছে।
শ্লোক ৩১
সংস্কৃত
আখ্যাহি মে কো ভবানুগ্ররূপো নমোঽস্তু তে দেববর প্রসীদ। বিজ্ঞাতুমিচ্ছামি ভবন্তমাদ্যং ন হি প্রজানামি তব প্রবৃত্তিম্।।
বাংলা অর্থ
হে উগ্ররূপী দেববর! আপনি কে, তা আমাকে বলুন। আপনাকে প্রণাম করি, আপনি প্রসন্ন হোন। হে আদি পুরুষ! আমি আপনাকে বিশেষভাবে জানতে চাই, কারণ আপনার এই প্রবৃত্তির উদ্দেশ্য আমি বুঝতে পারছি না।
শ্লোক ৩২
সংস্কৃত
শ্রীভগবানুবাচ: কালোঽস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো লোকান্ সমাহর্তুমিহ প্রবৃত্তঃ। ঋতেঽপি ত্বাং ন ভবিষ্যন্তি সর্বে যেঽবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষু যোধাঃ।।
বাংলা অর্থ
শ্রীভগবান বললেন—আমি লোকক্ষয়কারী প্রবৃদ্ধ কাল; এখন লোকসমূহকে সংহার করতে প্রবৃত্ত হয়েছি। তুমি যুদ্ধ না করলেও প্রতিপক্ষীয় যোদ্ধারা কেউই জীবিত থাকবে না।
শ্লোক ৩৩
সংস্কৃত
তস্মাত্ত্বমুত্তিষ্ঠ যশো লভস্ব জিত্বা শত্রুন্ ভুঙ্ক্ষ্ব রাজ্যং সমৃদ্ধম্। মৈবৈতে নিহতাঃ পূর্বমেব নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্।।
বাংলা অর্থ
অতএব তুমি যুদ্ধার্থে উথিত হও এবং যশ লাভ করো; শত্রুদের জয় করে সমৃদ্ধ রাজ্য ভোগ করো। এরা আমার দ্বারাই আগে নিহত হয়েছে; হে সব্যসাচিন! তুমি কেবল নিমিত্তমাত্র হও।
শ্লোক ৩৪
সংস্কৃত
দ্রোণং চ ভীষ্মং চ জয়দ্রথং চ কর্ণং তথান্যানপি যোধবীরান্। ময়া হতংস্ত্বং জহি মা ব্যথিষ্ঠা যুধ্যস্ব জেতাসি রণে সপত্নান্।।
বাংলা অর্থ
দ্রোণ, ভীষ্ম, জয়দ্রথ, কর্ণ এবং অন্যান্য বীর যোদ্ধারা আমার দ্বারাই নিহত হয়েছেন, তুমি তাঁদের বিনাশ করো; ব্যথিত হয়ো না। যুদ্ধ করো, যুদ্ধে তুমি অবশ্যই শত্রুদের পরাজিত করবে।
শ্লোক ৩৫
সংস্কৃত
সঞ্জয় উবাচ: এতচ্ছ্রুত্বা বচনং কেশবস্য কৃতাঞ্জলিৰ্বেপমানঃ কিরীটী। নমস্কৃত্বা ভূয় এবাহ কৃষ্ণং সগদ্গদং ভীতভীতঃ প্রণম্য।।
বাংলা অর্থ
সঞ্জয় বললেন—কেশবের এই কথা শুনে অর্জুন অত্যন্ত ভীত হয়ে হাত জোড় করে কাঁপতে কাঁপতে কৃষ্ণকে নমস্কার করলেন এবং গদগদ কণ্ঠে পুনরায় প্রণাম করে বললেন।
শ্লোক ৩৬
সংস্কৃত
অর্জুন উবাচ: স্থানে হৃষীকেশ তব প্রকীর্ত্যা জগৎ প্রহৃষ্যত্যনুরজ্যতে চ। রক্ষাংসি ভী তানি দিশো দ্রবন্তি সর্বে নমস্যন্তি চ সিদ্ধসঙ্ঘাঃ।।
বাংলা অর্থ
অর্জুন বললেন—হে হৃষীকেশ! আপনার মহিমা কীর্তনে জগৎ আনন্দিত ও অনুরক্ত হচ্ছে; রাক্ষসরা ভীত হয়ে চারদিকে পালিয়ে যাচ্ছে এবং সিদ্ধগণ আপনাকে নমস্কার করছেন—এ সবই যুক্তিসঙ্গত।
শ্লোক ৩৭
সংস্কৃত
কস্মাচ্চ তে ন নমেরন্ মহাত্মন্ গরীয়সে ব্রহ্মণোঽপ্যাদিকর্ত্রে। অনন্ত দেবেশ জগন্নিবাস ত্বমক্ষরং সদসত্তৎপরং যৎ।।
বাংলা অর্থ
হে মহাত্মন! আপনি ব্রহ্মারও আদি স্রষ্টা ও গুরু; তাঁরা কেন আপনাকে নমস্কার করবেন না? হে অনন্ত! হে দেবেশ! হে জগন্নিবাস! আপনিই অক্ষর ব্রহ্ম, আপনিই সৎ ও অসৎ এবং তাদের অতীত পরম তত্ত্ব।
শ্লোক ৩৮
সংস্কৃত
ত্বমাদিদেবঃ পুরুষঃ পুরাণস্ত্বমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্। বেত্তাসি বেদ্যং চ পরং চ ধাম ত্বয়া ততং বিশ্বমনন্তরূপ।।
বাংলা অর্থ
আপনিই আদিদেব, সনাতন পুরুষ এবং এই বিশ্বের পরম আশ্রয়। আপনিই জ্ঞাতা, আপনিই জ্ঞাতব্য বস্তু এবং আপনিই পরম ধাম। হে অনন্তরূপ! আপনার দ্বারাই এই সমগ্র বিশ্ব পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে।
শ্লোক ৩৯
সংস্কৃত
বায়ুর্যমোঽগ্নিৰ্ব রুণঃ শশাঙ্কঃ প্রজাপতিস্ত্বং প্রপিতামহশ্চ। নমো নমস্তেঽস্তু সহস্রকৃত্বঃ পুনশ্চ ভূয়োঽপি নমো নমস্তে।।
বাংলা অর্থ
আপনিই বায়ু, যম, অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র, ব্রহ্মা এবং ব্রহ্মারও পিতা অর্থাৎ প্রপিতামহ। আপনাকে সহস্রবার নমস্কার এবং পুনরায় আপনাকে বারবার নমস্কার।
শ্লোক ৪০
সংস্কৃত
নমঃ পুরস্তাদথ পৃষ্ঠতস্তে নমোঽস্তু তে সৰ্বত এব সর্ব। অনন্তবীর্যামিতবিক্রমস্ত্বং সর্বং সমাপ্নোষি ততোঽসি সর্বঃ।।
বাংলা অর্থ
হে সর্বস্বরূপ! আপনাকে সামনে থেকে ও পেছন থেকে নমস্কার; আপনাকে সব দিক থেকেই নমস্কার। আপনি অনন্ত বীর্য ও অসীম বিক্রমশালী; আপনি সমস্ত জগৎকে ব্যাপ্ত করে আছেন, তাই আপনিই সর্বস্বরূপ।
শ্লোক ৪১
সংস্কৃত
সখেতি মত্বা প্রসভং যদুক্তং হে কৃষ্ণ হে যাদব হে সখেতি। অজানতা মহিমানং তবেদং ময়া প্রমাদাৎ প্রণয়েন বাপি।।
বাংলা অর্থ
আপনার এই মহিমা না জেনে সখা মনে করে প্রমাদবশত বা প্রণয়বশত আমি আপনাকে 'হে কৃষ্ণ', 'হে যাদব', 'হে সখা' বলে সম্বোধন করেছি।
শ্লোক ৪২
সংস্কৃত
যচ্চাবহাসার্থমসৎকৃতোঽসি বিহারশয্যাসনভোজনেষু। একোঽথবাপ্যচ্যুত তৎসমক্ষং তৎক্ষাময়ে ত্বামহমপ্রমেয়ম্।।
বাংলা অর্থ
হে অচ্যুত! বিহার, শয়ন, উপবেশন ও ভোজনের সময় একাকী বা অন্যদের সামনে পরিহাসচ্ছলে আপনার যে অবমাননা করেছি, হে অপ্রমেয়! সেজন্য আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
শ্লোক ৪৩
সংস্কৃত
পিতাসি লোকস্য চরাচরস্য ত্বমস্য পূজ্যশ্চ গুরুর্গরীয়ান্। ন ত্বৎসমেঽস্ত্যভ্যধিকঃ কুতোঽন্যো লোকত্রয়েঽপ্যপ্রতিমপ্রভাব।।
বাংলা অর্থ
আপনি এই চরাচর জগতের পিতা, পূজনীয় ও শ্রেষ্ঠ গুরু। হে অতুলনীয় প্রভাবশালী! ত্রিভুবনে আপনার সমান কেউই নেই, অধিক আর কেউ কীভাবে থাকবে?
শ্লোক ৪৪
সংস্কৃত
তস্মাৎ প্রণম্য প্রণিধায় কায়ং প্রসাদয়ে ত্বামহমীশমীড্যম্। পিতেব পুত্রস্য সখেব সখ্যুঃ প্রিয়ঃ প্রিয়ায়ার্হসি দেব সোঢুম্।।
বাংলা অর্থ
অতএব আমি দণ্ডবৎ প্রণাম করে স্তুতিযোগ্য ঈশ্বর আপনার প্রসন্নতা ভিক্ষা করছি। পিতা যেমন পুত্রের, সখা যেমন সখার এবং প্রিয় যেমন প্রিয়ার অপরাধ সহ্য করেন, আপনিও তেমনি আমার অপরাধ ক্ষমা করুন।
শ্লোক ৪৫
সংস্কৃত
অদৃষ্টপূর্বং হৃষিতোঽস্মি দৃষ্ট্বা ভয়েন চ প্রব্যথিতং মনো মে। তদেব মে দর্শয় দেব রূপং প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস।।
বাংলা অর্থ
আগে কখনও দেখিনি এমন রূপ দেখে আমি আনন্দিত হয়েছি এবং ভয়ে আমার মন ব্যথিত হচ্ছে। হে দেবেশ! হে জগন্নিবাস! আপনি প্রসন্ন হোন এবং আপনার সেই পূর্বরূপই আমাকে দেখান।
শ্লোক ৪৬
সংস্কৃত
কিরীটিনং গদিনং চক্রহস্ত-মিচ্ছামি ত্বাং দ্রষ্টুমহং তথৈব। তেনৈব রূপেণ চতুর্ভুজেন সহস্রবাহো ভব বিশ্বমূর্তে।।
বাংলা অর্থ
আমি আপনাকে কিরীট, গদা ও চক্রধারী সেই আগের রূপেই দেখতে ইচ্ছা করি। হে সহস্রবাহো! হে বিশ্বমূর্তে! আপনি সেই চতুর্ভুজ রূপ ধারণ করুন।
শ্লোক ৪৭
সংস্কৃত
শ্রীভগবানুবাচ: ময়া প্রসন্নেন তবার্জুনেদং রূপং পরং দর্শিতমাত্মযোগাৎ। তেজোময়ং বিশ্বমনন্তমাদ্যং যন্মে ত্বদন্যেন ন দৃষ্টপূর্বম্।।
বাংলা অর্থ
শ্রীভগবান বললেন—হে অর্জুন! আমি প্রসন্ন হয়ে আত্মযোগ প্রভাবে আমার এই তেজোময়, আদি, অনন্ত বিশ্বরূপ তোমাকে দেখালাম; যা তুমি ছাড়া এর আগে কেউ দেখেনি।
শ্লোক ৪৮
সংস্কৃত
ন বেদযজ্ঞাধ্যয়নৈর্ন দানৈ-র্ন চ ক্রিয়াভির্ন তপোভিরুগ্রৈঃ। এবংরূপঃ শক্য অহং নৃলোকে দ্রষ্টুং ত্বদন্যেন কুরুপ্রবীর।।
বাংলা অর্থ
হে কুরুপ্রবীর! এই মনুষ্যলোকে তুমি ছাড়া আর কেউই বেদ পাঠ, যজ্ঞানুষ্ঠান, দান, কর্ম বা কঠোর তপস্যার দ্বারা আমার এই রূপ দর্শন করতে সমর্থ নয়।
শ্লোক ৪৯
সংস্কৃত
মা তে ব্যথা মা চ বিমূঢ়ভাবো দৃষ্ট্বা রূপং ঘোরমীদৃঙ্মমেদম্। ব্যপেতভীঃ প্রীতমনাঃ পুনস্ত্বং তদেব মে রূপমিদং প্রপশ্য।।
বাংলা অর্থ
আমার এই প্রকার ঘোর রূপ দেখে তোমার যেন ব্যথা বা মোহ না হয়। তুমি নির্ভয় ও প্রসন্নচিত্ত হয়ে আমার সেই আগের রূপ পুনরায় দর্শন করো।
শ্লোক ৫০
সংস্কৃত
সঞ্জয় উবাচ: ইত্যৰ্জুনং বাসুদেবস্তথোক্ত্বা স্বকং রূপং দর্শয়ামাস ভূয়ঃ। আশ্বাসয়ামাস চ ভীতমেনং ভূত্বা পুনঃ সৌম্যবপুর্মহাত্মা।।
বাংলা অর্থ
সঞ্জয় বললেন—বাসুদেব অর্জুনকে এই কথা বলে পুনরায় নিজের রূপ দেখালেন এবং সেই মহাত্মা পুনরায় সৌম্য রূপ ধারণ করে ভীত অর্জুনকে আশ্বস্ত করলেন।
শ্লোক ৫১
সংস্কৃত
অর্জুন উবাচ: দৃষ্ট্বেদং মানুষং রূপং তব সৌম্যং জনার্দন। ইদানীমস্মি সংবৃত্তঃ সচেতাঃ প্রকৃতিং গতঃ।।
বাংলা অর্থ
অর্জুন বললেন—হে জনার্দন! আপনার এই অতি সৌম্য ও সুন্দর মানুষ রূপ দেখে এখন আমি শান্ত হলাম এবং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেলাম।
শ্লোক ৫২
সংস্কৃত
শ্রীভগবানুবাচ: সুদুর্দর্শমিদং রূপং দৃষ্টবানসি যন্মম। দেবা অপ্যস্য রূপস্য নিত্যং দর্শনকাঙ্ক্ষিণঃ।।
বাংলা অর্থ
শ্রীভগবান বললেন—আমার যে রূপ তুমি দেখলে, তা দর্শন করা অত্যন্ত কঠিন। দেবতারাও সর্বদা এই রূপ দর্শনের আকাঙ্ক্ষা করেন।
শ্লোক ৫৩
সংস্কৃত
নাহং বেদৈর্ন তপসা ন দানেন ন চেজ্যয়া। শক্য এবংবিধো দ্রষ্টুং দৃষ্টবানসি মাং যথা।।
বাংলা অর্থ
তুমি আমাকে যেভাবে দেখলে, সেভাবে আমাকে কেবল বেদাধ্যয়ন, তপস্যা, দান বা যজ্ঞের দ্বারা দেখা সম্ভব নয়।
শ্লোক ৫৪
সংস্কৃত
ভক্ত্যা ত্বনন্যয়া শক্য অহমেবংবিধোঽর্জুন। জ্ঞাতুং দ্রষ্টুং চ তত্ত্বন প্রবেষ্টুং চ পরন্তপ।।
বাংলা অর্থ
হে অর্জুন! হে পরন্তপ! একমাত্র অনন্য ভক্তির মাধ্যমেই আমাকে এইভাবে তত্ত্বত জানা, দেখা এবং আমার মধ্যে প্রবেশ করা সম্ভব।
শ্লোক ৫৫
সংস্কৃত
মৎকর্মকৃন্মৎপরমো মদ্ভক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ। নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু যঃ স মামেতি পাণ্ডব।।
বাংলা অর্থ
হে পাণ্ডব! যে ব্যক্তি আমার প্রীতির জন্য কর্ম করেন, আমাকেই পরম গতি মনে করেন, আমার ভক্ত, আসক্তিহীন এবং সকল প্রাণীর প্রতি শত্রুহীন—তিনিই আমাকে লাভ করেন।
উপসংহার
অধ্যায় সমাপ্তি
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াম যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে 'বিশ্বরূপদর্শনযোগো' নাম একাদশ অধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ।
শেষ কথা
এখানেই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ‘বিশ্বরূপদর্শনযোগ’ নামক একাদশ অধ্যায় সমাপ্ত হলো।