শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা

ষোড়শ অধ্যায় { দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ }

শ্লোক ০১
সংস্কৃত
শ্রীভগবানুবাচ: অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধিজ্ঞানযোগব্যবস্তিতিঃ। দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্।।
বাংলা অর্থ
শ্রীভগবান বললেন—ভয়শূন্যতা, অন্তরের নির্মলতা, তত্ত্বজ্ঞানে নিষ্ঠা, দান, ইন্দ্রিয়দমন, যজ্ঞ, শাস্ত্রপাঠ, তপস্যা ও সরলতা।
শ্লোক ০২
সংস্কৃত
অহিংসা সত্যমক্রোধস্ত্যাগঃ শান্তিরপৈশুনম্। দয়া ভূতেষ্বলৌলুপ্ত্বং মার্দবং হ্রীরচাপলম্।।
বাংলা অর্থ
অহিংসা, সত্য, ক্রোধশূন্যতা, ত্যাগ, শান্তি, পরনিন্দা না করা, জীবের প্রতি দয়া, লোভহীনতা, মৃদুতা, লজ্জা ও অচপলতা।
শ্লোক ০৩
সংস্কৃত
তেজঃ ক্ষমা ধৃতিঃ শৌচমদ্রোহো নাতিমানিতা। ভবন্তি সম্পদং দৈবীমভিজাতস্য ভারত।।
বাংলা অর্থ
তেজ, ক্ষমা, ধৈর্য, শৌচ, শত্রুতাশূন্যতা ও অভিমানহীনতা—হে ভারত! এই গুণগুলি দৈবী সম্পদ নিয়ে জাত ব্যক্তির লক্ষণ।
শ্লোক ০৪
সংস্কৃত
দম্ভো দর্পোহভিমানশ্চ ক্রোধঃ পারুষ্যমেব চ। অজ্ঞানং চাভিজাতস্য পার্থ সম্পদমাসুরীম্।।
বাংলা অর্থ
দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, রূঢ়তা ও অজ্ঞানতা—হে পার্থ! এইগুলি আসুরী সম্পদ নিয়ে জাত ব্যক্তির লক্ষণ।
শ্লোক ০৫
সংস্কৃত
দৈবী সম্পদ্বিমোক্ষায় নিবন্ধায়াসুরী মতা। মা শুচঃ সম্পদং দৈবীমভিজাতোঽসি পাণ্ডব।।
বাংলা অর্থ
দৈবী সম্পদ মুক্তির অনুকূল এবং আসুরী সম্পদ বন্ধনের কারণ বলে বিবেচিত হয়। হে পাণ্ডব! তুমি শোক করো না, কারণ তুমি দৈবী সম্পদ নিয়েই জন্মেছ।
শ্লোক ০৬
সংস্কৃত
দ্বৌ ভূতসর্গৌ লোকেঽস্মিন্ দৈব আসুর এব চ। দৈবো বিস্তরশঃ প্রোক্ত আসুরং পার্থ মে শৃণু।।
বাংলা অর্থ
হে পার্থ! এই জগতে প্রাণীদের স্বভাব দুই প্রকার—দৈব ও আসুর। দৈব স্বভাবের কথা বিস্তারিত বলেছি, এখন আসুর স্বভাবের কথা আমার কাছে শোন।
শ্লোক ০৭
সংস্কৃত
প্রবৃত্তিং চ নিবৃত্তিং চ জনা ন বিদুরাসুরাঃ। ন শৌচং নাপি চাচারো ন সত্যং তেষু বিদ্যতে।।
বাংলা অর্থ
আসুর স্বভাবের ব্যক্তিরা জানে না কোন কাজে প্রবৃত্ত হতে হয় এবং কোন কাজ থেকে নিবৃত্ত হতে হয়। তাদের মধ্যে শৌচ, আচার বা সত্য নেই।
শ্লোক ০৮
সংস্কৃত
অসত্যমপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বরম্। অপরস্পরসম্ভূতং কিমন্যৎ কামহৈতুকম্।।
বাংলা অর্থ
তারা বলে এই জগৎ সত্যহীন, ভিত্তিহীন ও ঈশ্বরহীন; কেবল স্ত্রী-পুরুষের সংযোগেই এর উৎপত্তি, কাম ছাড়া এর অন্য কোনো কারণ নেই।
শ্লোক ০৯
সংস্কৃত
এতাং দৃষ্টিমবষ্টভ্য নষ্টাত্মানোঽল্পবুদ্ধয়ঃ। প্রভবন্ত্যুগ্রকর্মাণঃ ক্ষয়ায় জগতোহহিতাঃ।।
বাংলা অর্থ
এইরূপ দৃষ্টি অবলম্বন করে সেই মন্দবুদ্ধি নষ্টাত্মা ব্যক্তিরা জগতের অমঙ্গলকারী উগ্রকর্মে লিপ্ত হয়ে জগৎ ধ্বংসের জন্য আবির্ভূত হয়।
শ্লোক ১০
সংস্কৃত
কামমাশ্রিত্য দুষ্পূরং দম্ভমানমদান্বিতাঃ। মোহাদগৃহীত্বাসদ্গ্রাহান্প্রবর্তন্তেঽশুচিব্রতাঃ।।
বাংলা অর্থ
তারা দুষ্পূরণীয় কামকে আশ্রয় করে দম্ভ, মান ও মদে মত্ত হয়ে মোহবশত অসৎ আদর্শ গ্রহণ করে এবং অশুচি ব্রতে প্রবৃত্ত হয়।
শ্লোক ১১
সংস্কৃত
চিন্তামপরিমেয়াং চ প্রলয়ান্তামুপাশ্রিতাঃ। কামোপভোগপরমা এতাবদিতি নিশ্চিতাঃ।।
বাংলা অর্থ
তারা মৃত্যু পর্যন্ত অশেষ দুশ্চিন্তায় মগ্ন থাকে। ইন্দ্রিয়সুখ ভোগই তাদের জীবনের চরম লক্ষ্য এবং তারা মনে করে যে এটাই সব।
শ্লোক ১২
সংস্কৃত
আশাপাশশতৈর্বদ্ধাঃ কামক্রোধপরায়ণাঃ। ঈহন্তে কামভোগার্থমন্যায়েনার্থসঞ্চয়ান্।।
বাংলা অর্থ
শত শত আশার পাশে আবদ্ধ হয়ে এবং কাম ও ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তারা বিষয়ভোগের লালসায় অন্যায়ভাবে অর্থ সঞ্চয় করার চেষ্টা করে।
শ্লোক ১৩
সংস্কৃত
ইদমদ্য ময়া লব্ধমিমং প্রাপ্স্যে মনোরথম্। ইদমস্তীদমপি মে ভবিষতি পুনর্ধনম্।।
বাংলা অর্থ
তারা ভাবে—আজ আমি এটা লাভ করেছি এবং আগামীকাল আমি অন্য একটি মনের ইচ্ছা পূরণ করব। এখন আমার এত ধন আছে এবং ভবিষ্যতে আরও ধন হবে।
শ্লোক ১৪
সংস্কৃত
অসৌ ময়া হতঃ শত্রুরহনিষ্যে চাপরানপি। ঈশ্বরোঽহমহং ভোগী সিদ্ধোঽহং বলবানি সুখী।।
বাংলা অর্থ
সেই শত্রুটি আমি বধ করেছি এবং অন্যদেরও আমি বধ করব। আমিই ঈশ্বর, আমিই ভোগী, আমিই সিদ্ধ, বলবান ও সুখী।
শ্লোক ১৫
সংস্কৃত
আঢ্যোঽভিজনবানস্মি কোঽন্যোঽস্তি সদৃশো ময়া। যক্ষ্যে দাস্যামি মোদিষ্য ইত্যজ্ঞানবিমোহিতাঃ।।
বাংলা অর্থ
আমি ধনী এবং অভিজাত বংশীয়। আমার মতো আর কে আছে? আমি যজ্ঞ করব, দান করব এবং আমোদ করব—অজ্ঞানতার দ্বারা তারা এভাবেই মোহগ্রস্ত থাকে।
শ্লোক ১৬
সংস্কৃত
অনেকচিত্তবিভ্রান্তা মোহজালসমাবৃতাঃ। প্রসক্তাঃ কামভোগেষু পতন্তি নরকেঽশুচৌ।।
বাংলা অর্থ
অসংখ্য চিন্তায় বিভ্রান্ত হয়ে এবং মোহের জালে আবদ্ধ হয়ে তারা কামভোগে মগ্ন থাকে এবং অশুচি নরকে পতিত হয়।
শ্লোক ১৭
সংস্কৃত
আত্মসম্ভাবিতাঃ স্তব্ধা ধনমানমদান্বিতাঃ। যজন্তে নামযজ্ঞৈস্তে দম্ভেনাবিধিপূর্বকম্।।
বাংলা অর্থ
তারা আত্ম-প্রশংসাকারী, উদ্ধত এবং ধন ও সম্মানের মদে মত্ত হয়ে নামমাত্র যজ্ঞ করে দম্ভের সাথে, শাস্ত্রবিধি অমান্য করে।
শ্লোক ১৮
সংস্কৃত
অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং চ সংশ্রিতাঃ। মামাত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তোঽভ্যসূয়কাঃ।।
বাংলা অর্থ
অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম ও ক্রোধকে আশ্রয় করে তারা নিজেদের ও অন্যদের দেহে অবস্থিত পরমাত্মা স্বরূপ আমাকে অবজ্ঞা ও নিন্দা করে।
শ্লোক ১৯
সংস্কৃত
তানহং দ্বিষতঃ ক্রূরান্ সংসারেষু নরাধমান্। ক্ষিপাম্যজস্রমশুভানাসুরীষ্বেব যোনিষু।।
বাংলা অর্থ
সেই দ্বেষকারী, ক্রূর ও নরাধম অশুভ ব্যক্তিদের আমি এই সংসারে বারবার আসুরী যোনিতে নিক্ষেপ করি।
শ্লোক ২০
সংস্কৃত
আসুরীং যোনিমাপন্না মূঢ়া জন্মনি জন্মনি। মামপ্রাপ্যৈব কৌন্তেয় ততো যান্ত্যধমাং গতিম্।।
বাংলা অর্থ
হে কৌন্তেয়! জন্মে জন্মে আসুরী যোনি প্রাপ্ত হয়ে সেই মূঢ় ব্যক্তিরা আমাকে লাভ করতে না পেরে চরম অধম গতি প্রাপ্ত হয়।
শ্লোক ২১
সংস্কৃত
ত্রিবিধং নরকস্যেদং দ্বারং নাশনমাত্মনঃ। কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেতৎ ত্রয়ং ত্যজেৎ।।
বাংলা অর্থ
কাম, ক্রোধ ও লোভ—এই তিনটি নরকের পথ, যা আত্মাকে ধ্বংস করে। তাই এই তিনটিকে অবশ্যই ত্যাগ করা উচিত।
শ্লোক ২২
সংস্কৃত
এতৈর্বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমোদ্বারৈস্ত্রিভির্বরঃ। আচরত্যাত্মনঃ শ্রেয়স্ততো যাতি পরাং গতিম্।।
বাংলা অর্থ
হে কৌন্তেয়! নরকের এই তিনটি তমোগুণময় দ্বার থেকে মুক্ত ব্যক্তি নিজের মঙ্গলের জন্য কাজ করেন এবং শেষে পরম গতি লাভ করেন।
শ্লোক ২৩
সংস্কৃত
যঃ শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য বর্ততে কামকারতঃ। ন স সিদ্ধিমবাপ্নোতি ন সুখং ন পরাং গতিম্।।
বাংলা অর্থ
যে শাস্ত্রীয় বিধি অমান্য করে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করে, সে সফলতা লাভ করতে পারে না এবং সুখ বা পরম গতি লাভ করতে পারে না।
শ্লোক ২৪
সংস্কৃত
তস্মাচ্ছাস্ত্ৰং প্রমাণং তে কার্যাকার্যব্যবস্থিতৌ। জ্ঞাত্বা শাস্ত্রবিধানোক্তং কর্ম কর্তুমিহার্হসি।।
বাংলা অর্থ
অতএব, কোনটি কর্তব্য এবং কোনটি অকর্তব্য তা নির্ধারণে শাস্ত্রই তোমার প্রমাণ। শাস্ত্রীয় বিধান জেনে নিয়ে তোমার কর্ম করা উচিত।
উপসংহার
অধ্যায় সমাপ্তি
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াম যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে 'দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগো' নাম ষোড়শ অধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ।
শেষ কথা
এখানেই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ‘দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগ’ নামক ষোড়শ অধ্যায় সমাপ্ত হলো।