শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা

চতুর্থ অধ্যায় { জ্ঞানকর্মসন্ন্যাসযোগ }

শ্লোক ০১
সংস্কৃত
শ্রীভগবানুবাচ: ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্। বিবস্বান্মনবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেঽব্রবীত্।।
বাংলা অর্থ
শ্রীভগবান বললেন— আমি পূর্বে সূর্যদেব বিবস্বানকে এই অব্যয় নিষ্কাম কর্মযোগ বলেছিলাম। বিবস্বান তাঁর পুত্র মনুকে বলেছিলেন এবং মনু তাঁর পুত্র ইক্ষ্বাকুকে বলেছিলেন।
শ্লোক ০২
সংস্কৃত
এবং পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ। স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ।।
বাংলা অর্থ
হে পরন্তপ! এইভাবে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় প্রাপ্ত এই যোগ রাজর্ষিরা জানতেন। কিন্তু মহাকালের প্রভাবে সেই যোগ এখন লুপ্ত হয়েছে।
শ্লোক ০৩
সংস্কৃত
স এবায়ং ময়া তেঽদ্য যোগঃ প্রোক্তঃ পুরাতনঃ। ভক্তোঽসি মে সখা চেতি রহস্যং হ্যেতদুত্তমম্।।
বাংলা অর্থ
তুমি আমার ভক্ত ও অত্যন্ত প্রিয় সখা, তাই সেই পুরাতন পরম রহস্যময় যোগ আজ আমি তোমাকে বললাম।
শ্লোক ০৪
সংস্কৃত
অর্জুন উবাচ: অপরং ভবতো জন্ম পরং জন্ম বিবস্বতঃ। কথমএতদ্বিজানীয়াম্ ত্বমাদৌ প্রোক্তবানিতি।।
বাংলা অর্থ
অর্জুন বললেন— সূর্যদেব বিবস্বানের জন্ম অনেক আগে হয়েছে, আর আপনার জন্ম হয়েছে সম্প্রতি। তাহলে আপনি যে সৃষ্টির শুরুতে তাঁকে এই যোগ বলেছিলেন, তা আমি কেমন করে বুঝব?
শ্লোক ০৫
সংস্কৃত
শ্রীভগবানুবাচ: বহূনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন। তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ।।
বাংলা অর্থ
শ্রীভগবান বললেন— হে অর্জুন! আমার ও তোমার বহু জন্ম অতীত হয়েছে। হে পরন্তপ! আমি সে সব জানি, কিন্তু তুমি তা জানো না।
শ্লোক ০৬
সংস্কৃত
অজোঽপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোঽপি সন্। প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া।।
বাংলা অর্থ
আমি জন্মরহিত, অবিনাশী এবং সমস্ত প্রাণীর ঈশ্বর হওয়া সত্ত্বেও নিজের প্রকৃতিকে আশ্রয় করে আমার অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা অবতীর্ণ হই।
শ্লোক ০৭
সংস্কৃত
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।।
বাংলা অর্থ
হে ভারত! যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখনই আমি নিজেকে প্রকাশ করি বা অবতীর্ণ হই।
শ্লোক ০৮
সংস্কৃত
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্। ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।
বাংলা অর্থ
সাধুদের রক্ষা করার জন্য, দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্মকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।
শ্লোক ০৯
সংস্কৃত
জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ। ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোঽর্জুন।।
বাংলা অর্থ
হে অর্জুন! আমার এই দিব্য জন্ম ও কর্মের তত্ত্ব যে সঠিকভাবে জানে, দেহত্যাগের পর তাকে আর পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় না, সে আমাকেই লাভ করে।
শ্লোক ১০
সংস্কৃত
বীতরাগভয়ক্রোধা মন্ময়া মামুপাশ্রিতাঃ। বহবো জ্ঞানতপসা পূতা মদ্ভাবমাগতাঃ।।
বাংলা অর্থ
আসক্তি, ভয় এবং ক্রোধ বর্জন করে আমাতে তন্ময় হয়ে এবং আমার শরণাগত হয়ে অতীতে বহু ব্যক্তি জ্ঞানরূপ তপস্যার দ্বারা পবিত্র হয়ে মদ্ভাব বা আমার স্বরূপ প্রাপ্ত হয়েছেন।
শ্লোক ১১
সংস্কৃত
যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্। মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।
বাংলা অর্থ
যে আমাকে যেভাবে ভজনা করে, আমি তাকে সেইভাবেই অনুগ্রহ করি। হে পার্থ! মানুষ সর্বতোভাবে আমার পথই অনুসরণ করে।
শ্লোক ১২
সংস্কৃত
কাঙ্ক্ষন্তঃ কর্মণাং সিদ্ধিং যজন্ত ইহ দেবতাঃ। ক্ষিপ্রং হি মানুষে লোকে সিদ্ধির্ভবতি কর্মজা।।
বাংলা অর্থ
কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা করে মানুষ এই মর্ত্যলোকে দেবতাদের পূজা করে। কারণ এই জগতে কর্মজনিত ফল অতি শীঘ্রই লাভ করা যায়।
শ্লোক ১৩
সংস্কৃত
চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ। তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্।।
বাংলা অর্থ
গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুসারে আমি চতুর্বর্ণের সৃষ্টি করেছি। আমি এই ব্যবস্থার স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অবিনাশী বলে জানবে।
শ্লোক ১৪
সংস্কৃত
ন মাং কর্মাণি লিম্পন্তি ন মে কর্মফলে স্পৃহা। ইতি মাং যোঽভিজানাতি কর্মভির্ন স বধ্যতে।।
বাংলা অর্থ
কর্ম আমাকে লিপ্ত করে না এবং কর্মফলেও আমার কোনো স্পৃহা নেই। যিনি আমাকে এভাবে জানেন, তিনি আর কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হন না।
শ্লোক ১৫
সংস্কৃত
এবং জ্ঞাত্বা কৃতং কর্ম পূর্বৈরপি মুমুক্ষুভিঃ। কুরু কর্মৈব তস্মাত্ত্বং পূর্বৈঃ পূর্বতরং কৃতম্।।
বাংলা অর্থ
পূর্বকালের মুমুক্ষু ব্যক্তিগণ এই রহস্য জেনে কর্ম করেছিলেন। অতএব তুমিও পূর্বপুরুষদের দ্বারা প্রদর্শিত সেই নিষ্কাম কর্মই সম্পাদন করো।
শ্লোক ১৬
সংস্কৃত
কিং কর্ম কিমকর্মেতি কবয়োঽপ্যত্র মোহিতাঃ। তত্তে কর্ম প্রবক্ষ্যামি যজজ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেঽশুভাৎ।।
বাংলা অর্থ
কর্ম কী এবং অকর্ম কী— এ বিষয়ে পন্ডিতগণও বিভ্রান্ত হন। আমি তোমাকে সেই কর্মের কথা বলব, যা জানলে তুমি অশুভ বা সংসার-বন্ধন থেকে মুক্তি পাবে।
শ্লোক ১৭
সংস্কৃত
কর্মণো হ্যপি বোদ্ধব্যং বোদ্ধব্যং চ বিকর্মণঃ। অকর্মণশ্চ বোদ্ধব্যং গহনা কর্মণো গতিঃ।।
বাংলা অর্থ
বিহিত কর্মের গতি জানা উচিত, নিষিদ্ধ কর্মের (বিকর্ম) গতি জানা উচিত এবং অকর্মের গতিও জানা উচিত। কর্মের গতি অত্যন্ত নিগূঢ়।
শ্লোক ১৮
সংস্কৃত
কর্মণ্যকর্ম যঃ পশ্যেদকর্মণি চ কর্ম যঃ। স বুদ্ধিমান্মনুষ্যেষু স যুক্তঃ কৃৎস্নকর্মকৃত্।।
বাংলা অর্থ
যিনি কর্মের মধ্যে অকর্ম এবং অকর্মের মধ্যে কর্ম দর্শন করেন, তিনিই মানুষের মধ্যে বুদ্ধিমান। তিনি যোগী এবং তিনি সমস্ত কর্ম সম্পাদন করেছেন।
শ্লোক ১৯
সংস্কৃত
যস্য সর্বে সমারম্ভাঃ কামসংকল্পবর্জিতাঃ। জ্ঞানাগ্নিদগ্ধকর্মাণং তমাহুঃ পণ্ডিতং বুধাঃ।।
বাংলা অর্থ
যাঁর সমস্ত কর্ম প্রচেষ্টা কামনাবিহীন ও সংকল্পমুক্ত এবং যাঁঁর কর্ম জ্ঞানরূপ অগ্নির দ্বারা দগ্ধ হয়েছে, জ্ঞানীগণ তাঁকেই 'পণ্ডিত' বলেন।
শ্লোক ২০
সংস্কৃত
ত্যক্ত্বা কর্মফলাসঙ্গং নিত্যতৃপ্তো নিরাশ্রয়ঃ। কর্মণ্যভিপ্রবৃত্তোঽপি নৈব কিঞ্চিৎকরোতি সঃ।।
বাংলা অর্থ
যিনি কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ করে সর্বদা তৃপ্ত এবং বাহ্য কোনো আশ্রয়ের প্রত্যাশা করেন না, তিনি কর্মে প্রবৃত্ত হলেও বাস্তবে কিছুই করেন না।
শ্লোক ২১
সংস্কৃত
নিরাশীর্যতচিত্তাত্মা ত্যক্তসর্বপরিগ্রহঃ। শারীরং কেবলং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্।।
বাংলা অর্থ
যিনি কামনাহীন, যাঁর মন ও আত্মা সংযত এবং যিনি সকল ভোগ সামগ্রী ত্যাগ করেছেন, তিনি কেবল শরীর রক্ষার জন্য কর্ম করলেও কোনো পাপের ভাগী হন না।
শ্লোক ২২
সংস্কৃত
যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্টো দ্বন্দ্বাতীতো বিমৎসরঃ। সমঃ সিদ্ধাবসিদ্ধৌ চ কৃত্বাপি ন নিবধ্যতে।।
বাংলা অর্থ
যিনি অযাচিতভাবে যা লাভ হয় তাতেই সন্তুষ্ট, যিনি সুখ-দুঃখের ঊর্ধ্বে, ঈর্ষামুক্ত এবং সফলতায় ও ব্যর্থতায় সমান অবিচল— তিনি কর্ম করেও তাতে আবদ্ধ হন না।
শ্লোক ২৩
সংস্কৃত
গতসঙ্গস্য মুক্তস্য জ্ঞানাবস্থিতচেতসঃ। যজ্ঞায়াচরত্ কর্ম সমগ্রং প্রবিলীয়তে।।
বাংলা অর্থ
যাঁর আসক্তি দূর হয়েছে, যিনি মুক্ত এবং যাঁর চিত্ত জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত, পরমেশ্বরের সন্তুষ্টির জন্য কৃত তাঁর সমস্ত কর্ম সম্পূর্ণ লীন হয়ে যায়।
শ্লোক ২৪
সংস্কৃত
ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবির্ ব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্। ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্মসমাধিনা।।
বাংলা অর্থ
অর্পণ ব্রহ্ম, আহুতি ব্রহ্ম, ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে ব্রহ্মকর্তৃক যে হোম করা হয়েছে তাও ব্রহ্ম। যিনি ব্রহ্মকর্মে সমাহিত, তিনি ব্রহ্মকেই লাভ করেন।
শ্লোক ২৫
সংস্কৃত
দৈবমেবাপরে যজ্ঞং যোগিনঃ পর্যুপাসতে। ব্রহ্মাগ্নাবপরে যজ্ঞং যজ্ঞেনৈবোপজুহ্বতি।।
বাংলা অর্থ
কোনো কোনো যোগী দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করেন, আবার কোনো কোনো যোগী ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে আত্মার দ্বারা যজ্ঞ সম্পাদন করেন।
শ্লোক ২৬
সংস্কৃত
শ্রোত্রাদীনীন্দ্রিয়াণ্যন্যে সংযমাগ্নিষু জুহ্বতি। শব্দাদীন্বিষয়ানন্য ইন্দ্রিয়াগ্নিষু জুহ্বতি।।
বাংলা অর্থ
কেউ কেউ কান প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযমরূপ অগ্নিতে আহুতি দেন, আবার কেউ কেউ শব্দ প্রভৃতি বিষয়গুলিকে ইন্দ্রিয়রূপ অগ্নিতে আহুতি দেন।
শ্লোক ২৭
সংস্কৃত
সর্বাণীন্দ্রিয়কর্মাণি প্রাণকর্মাণি চাপরে। আত্মসংযমযোগাগ্নৌ জুহ্বতি জ্ঞানদীপিতে।।
বাংলা অর্থ
অন্যান্যরা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের কাজ এবং প্রাণের কাজ জ্ঞানদীপ্ত আত্মসংযমরূপ যোগাগ্নিতে আহুতি দিয়ে থাকেন।
শ্লোক ২৮
সংস্কৃত
দ্রব্যযজ্ঞাস্তপোযজ্ঞায্যোগযজ্ঞাথাস্তথাপরে। স্বাধ্যায়জ্ঞানযজ্ঞাশ্চ যতয়ঃ সংশিতব্রতাঃ।।
বাংলা অর্থ
কঠোর ব্রত পালনকারী কেউ কেউ দ্রব্য দানরূপ যজ্ঞ, কেউ তপোযজ্ঞ, কেউ যোগযজ্ঞ, আবার কেউ শাস্ত্র অধ্যয়নরূপ জ্ঞানযজ্ঞ সম্পাদন করেন।
শ্লোক ২৯
সংস্কৃত
অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণেঽপানং তথাপরে। প্রাণাপানগতী রুদ্ধ্বা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ।।
বাংলা অর্থ
আবার কেউ কেউ অপান বায়ুতে প্রাণ বায়ুকে এবং প্রাণ বায়ুতে অপান বায়ুকে আহুতি দিয়ে প্রাণায়ামপরায়ণ হন।
শ্লোক ৩০
সংস্কৃত
অপরে নিয়তাহারাঃ প্রাণান্প্রাণেষু জুহ্বতি। সর্বেঽপ্যেতে যজ্ঞবিদো যজ্ঞক্ষপিতকল্মষাঃ।।
বাংলা অর্থ
কেউ কেউ আহার সংযত করে প্রাণবায়ুসমূহকে প্রাণেই আহুতি দেন। এই সকল যজ্ঞকারী যজ্ঞের দ্বারা পাপমুক্ত হন।
শ্লোক ৩১
সংস্কৃত
যজ্ঞশিষ্টামৃতভুজো যান্তি ব্রহ্ম সনাতনম্। নায়ং লোকোঽস্ত্যযজ্ঞস্য কুতোঽন্যঃ কুরুসত্তম।।
বাংলা অর্থ
হে কুরুশ্রেষ্ঠ! যজ্ঞ অবশিষ্ট অমৃতভোজী ব্যক্তিগণ সনাতন ব্রহ্মকে লাভ করেন। যজ্ঞহীন ব্যক্তির জন্য এই লোকই সুখকর নয়, পরলোক কীভাবে হবে?
শ্লোক ৩২
সংস্কৃত
এবং বহুবিধা যজ্ঞা বিততা ব্রহ্মণো মুখে। কর্মজান্বিদ্ধি তান্ সর্বানেবং জ্ঞাত্বা বিমোক্ষ্যসে।।
বাংলা অর্থ
এইভাবে বহু প্রকার যজ্ঞ বেদে বর্ণিত হয়েছে। সেই সমস্ত যজ্ঞই কর্ম থেকে উৎপন্ন বলে জানবে। এ কথা জানলে তুমি সংসার বন্ধন থেকে মুক্তি পাবে।
শ্লোক ৩৩
সংস্কৃত
শ্রেয়ান্দ্রব্যময়াদ্যজ্ঞাজ্জ্ঞানযজ্ঞঃ পরন্তপ। সর্বং কর্মাখিলং পার্থ জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে।।
বাংলা অর্থ
হে পরন্তপ! দ্রব্যময় যজ্ঞ অপেক্ষা জ্ঞানযজ্ঞ শ্রেষ্ঠ। হে পার্থ! সমস্ত কর্মই জ্ঞানে পরিসমাপ্ত হয়।
শ্লোক ৩৪
সংস্কৃত
তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া। উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ।।
বাংলা অর্থ
প্রণিপাত (প্রণাম), পরিপ্রশ্ন (জিজ্ঞাসা) এবং সেবার মাধ্যমে সেই জ্ঞান লাভ করার চেষ্টা করো। তত্ত্বদর্শী জ্ঞানীগণ তোমাকে সেই জ্ঞান দান করবেন।
শ্লোক ৩৫
সংস্কৃত
যজ্জ্ঞাত্বা ন পুনর্মোহমেবং যাস্যসি পাণ্ডব। যেন ভূতান্যশেষেণ দ্রক্ষ্যস্যাত্মন্যথো ময়ি।।
বাংলা অর্থ
হে পাণ্ডব! সেই জ্ঞান লাভ করলে তুমি আর মোহাচ্ছন্ন হবে না এবং সমস্ত জীবকে নিজের আত্মায় ও আমাতে দর্শন করবে।
শ্লোক ৩৬
সংস্কৃত
অপি চেদসি পাপেভ্যঃ সর্বেভ্যঃ পাপকৃত্তমঃ। সর্বং জ্ঞানপ্লবেনৈব বৃজিনং সন্তরিষ্যসি।।
বাংলা অর্থ
যদি তুমি সমস্ত পাপীদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক পাপী হও, তবুও জ্ঞানরূপ ভেলায় চড়ে তুমি সমস্ত পাপ-সমুদ্র পার হতে পারবে।
শ্লোক ৩৭
সংস্কৃত
যথৈধাংসি সমিদ্ধোঽগ্নির্ভস্মসাৎ কুরুতেঽর্জুন। জ্ঞানাগ্নিঃ সর্বকর্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা।।
বাংলা অর্থ
হে অর্জুন! প্রজ্বলিত অগ্নি যেমন কাষ্ঠকে ভস্মীভূত করে, জ্ঞানরূপ অগ্নি তেমনি সমস্ত কর্মফলকে ভস্মসাৎ করে দেয়।
শ্লোক ৩৮
সংস্কৃত
ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রম্ ইহ বিদ্যতে। তৎ স্বয়ং যোগসংসিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি।।
বাংলা অর্থ
এই জগতে জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছুই নেই। দীর্ঘকাল যোগ সাধনার দ্বারা সিদ্ধিলাভ করে সাধক সেই জ্ঞান নিজের হৃদয়ে অনুভব করেন।
শ্লোক ৩৯
সংস্কৃত
শ্রদ্ধাবান্লভতে জ্ঞানং তত্পরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ। জ্ঞানং লব্ধ্বা পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি।।
বাংলা অর্থ
শ্রদ্ধাবান, নিষ্ঠাবান ও ইন্দ্রিয়জয়ী ব্যক্তি জ্ঞান লাভ করেন। সেই পরম জ্ঞান লাভ করে তিনি শীঘ্রই পরম শান্তি প্রাপ্ত হন।
শ্লোক ৪০
সংস্কৃত
অজ্ঞশ্চাশ্রদ্দধানশ্চ সংশয়াত্মা বিনশ্যতি। নায়ম্ লোকোঽস্তি ন পরো ন সুখং সংশয়াত্মনঃ।।
বাংলা অর্থ
অজ্ঞ, শ্রদ্ধাহীন এবং সংশয়ী ব্যক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। সংশয়ী ব্যক্তির ইহকাল নেই, পরকাল নেই এবং সুখও নেই।
শ্লোক ৪১
সংস্কৃত
যোগসন্ন্যস্তকর্মাণং জ্ঞানসঞ্ছিন্নসংশয়ম্। আত্মবন্তং ন কর্মাণি নিবধ্নন্তি ধনঞ্জয়।।
বাংলা অর্থ
হে ধনঞ্জয়! যিনি নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারা কর্ম ত্যাগ করেছেন এবং জ্ঞানের দ্বারা সংশয় ছিন্ন করেছেন, সেই আত্মবান ব্যক্তিকে কর্ম আবদ্ধ করতে পারে না।
শ্লোক ৪২
সংস্কৃত
তস্মাদজ্ঞানসম্ভূতং হৃৎস্থং জ্ঞানাসিনা ত্মনঃ। ছিত্ত্বৈনং সংশয়ং যোগমাতিষ্ঠোত্তিষ্ঠ ভারত।।
বাংলা অর্থ
অতএব হে ভারত! তোমার হৃদয়ে স্থিত অজ্ঞানপ্রসূত এই সংশয় জ্ঞানরূপ খড়্গ দিয়ে ছিন্ন করো। নিষ্কাম কর্মযোগে স্থিত হও এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।
উপসংহার
অধ্যায় সমাপ্তি
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াম যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে 'জ্ঞানকর্মসংন্যাসযোগো' নাম চতুর্থ অধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ।
শেষ কথা
এখানেই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ‘জ্ঞানকর্মসংন্যাসযোগ’ নামক চতুর্থ অধ্যায় সমাপ্ত হলো।